শিল্প সৃজনশীল, নান্দনিক, চিন্তাভাবনা, অন্তর্দৃষ্টি, আবেগ-অনুভূতি-আকাঙ্ক্ষার অভিব্যক্তি। শিল্পে বাস্তবতা, পরাবাস্তবতা, কল্পনা,রহস্যময়তা, মূর্ত- বিমূর্ততা, নাটকীয়তা, রোম্যান্টিকতাসহ আছে আরও নানা দিক।
শিল্প আমাদের মনের খোরাক, আত্মিক চাহিদা, রুচির দুর্ভিক্ষ মোচন করে এবং বোধের চাহিদা পূরণ করে/ দিগন্ত উন্মোচন করে । কিন্তু শিল্প কি সত্যিই আমাদের সুখ দিতে পারে? হাঁ পারে। সাম্প্রতিক এক বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা যায় শিল্প শুধুমাত্র সৃষ্টি করে নয় দেখা বা উপলব্ধির মাধ্যমেও প্রকৃত সুখ পাওয়া যায়। নিউরোএস্থেটিক্স এবং ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের অধ্যাপক সেমির জেকির একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে শিল্পকর্মের(চিত্রশিল্প) দিকে তাকালে রোমান্টিক প্রেমে উচ্ছ্বাস অভিজ্ঞতার মতো একই মানসিক প্রভাব পরে । অধ্যাপক জেকি বিশ্বের কয়েক জন সেরা শিল্পীদের ৩০টি চিত্রশিল্পের সিরিজ দর্শনার্থীদের দেখান। এ শিল্পকর্ম নির্বাচনের ক্ষেত্রে জেকি দ্রুপদি রীতিতে আঁকা বত্তিচেলির দ্যা বার্থ অফ ভেনাস থেকে লিওনার্দো দা ভিঞ্চির মননশীল কাজ এবং হিয়েরোনামাস বোশের কল্পনাপ্রসূত ট্রাইগ্লিফ সহ বিভিন্ন বিষয়ের প্রতি মনোযোগ দিয়েছেন। শিল্পকর্মগুলো দেখানোর পর যখন তিনি তাদের মস্তিষ্ক স্ক্যান করেন এবং তাদের মাঝে তিনি মিশ্র প্রতিক্রিয়া লক্ষ করেন। জেকির গবেষণা উঠে এসেছে - যেসব শিল্পকর্মকে তারা সবচেয়ে সুন্দর মনে করতো তাদের মস্তিষ্কের ফ্রন্টাল কর্টেক্সে রক্তের প্রবাহ ১০% পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতো- যা প্রিয়জনের দিকে তাকানোর সমতুল্য, এমনকি বিনোদনমূলক ড্রাগ ব্যবহারের মতো। সুন্দর বা অনুকূল কিছু দেখার ফলে মস্তিষ্কে ডোপামিনের(একটি হরমোন এবং নিউরো ট্রান্সমিটার যা মানব মস্তিষ্কে আনন্দ অনুভূতির আচরণিক সাড়াদানে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে) মাত্রা বৃদ্ধি পায়। পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে জন কনস্টেবল, ফরাসি নিওক্লাসিক্যাল চিত্রশিল্পী ইংগ্রেস এবং ১৭ শতকের ইতালীয় শিল্পী গুইডো রেনের আঁকা ছবিগুলি সবচেয়ে বেশি আনন্দে সাড়া জাগিয়েছিল। প্রদর্শিত অন্যান্য পেইন্টিং ছিল মনেট, রেমব্রান্ড এবং সেজানের মতো শিল্পীদের। গবেষণায় জেকি আরও লক্ষ্য করেন- শিল্পকর্মগুলি সাধারণত বিরক্তিকর বা কুৎসিত বলে মনে হয় (ধরা যাক হিয়েরোনামাস বোশ, হন্যরে দামিয়ের , ফ্লেমিশ শিল্পী মাসসিস এর কাজ) সেই গুলো দেখালে মস্তিষ্কে রক্ত প্রবাহ খুব কম ঘটে। প্রফেসর জেকি বলেন “আমরা দেখতে চাই যখন আপনি সুন্দর ছবিগুলি দেখেন তখন মস্তিষ্কে কী ঘটে। আমরা যা পেয়েছি তা হল যখন আপনি শিল্পের দিকে তাকান (যেমন ল্যান্ডস্কেপ, স্থির জীবন, বিমূর্ত বা প্রতিকৃতিতে) মস্তিষ্কের যে অংশ আনন্দের সাথে সম্পর্কিত সে অংশের কার্যকলাপ বেড়ে যায়”। আমরা মানুষকে একটি এম আর আাই স্ক্যানারে রাখি এবং প্রতি দশ সেকেন্ডে তাদের সিরিজের একটি করে চিত্র দেখাই। আমরা তখন মস্তিষ্কের একটি অংশে রক্ত প্রবাহে পরিবর্তনের হার পরিমাপ করি। একটি সুন্দর চিত্রকর্মের জন্য রক্তের প্রবাহ বেড়ে যায় ঠিক যেমন বেড়ে যায় যখন আপনি আপনার প্রিয় কাউকে দেখেন। এটি আমাদের বলে যে শিল্প মস্তিষ্কে সরাসরি অনুভূতিতে সাড়া দেয়। প্রতিক্রিয়া হয় ঝটপট । আমরা যা পেয়েছি তা হল রক্ত প্রবাহ বৃদ্ধি পায় পেইন্টিং কতটা পছন্দ হয়েছে সে অনুপাতে। পরীক্ষাটি কয়েক ডজন লোকের উপর করা হয়েছিল, যাদেরকে বাছাই করা হয়েছিল এলোমেলো ভাবে। যাদের শিল্প সম্পর্কে পূর্ব জ্ঞান ছিল না এবং তাই তারা বর্তমান রুচি এবং শিল্পীর ফ্যাশনেবল( fashionability) দ্বারা অযথা প্রভাবিত হবে না। প্রফেসর জেকি যোগ করেছেন: “আমরা যা করছি তা হল দীর্ঘদিন ধরে যা জানা আছে তাকে বৈজ্ঞানিক সত্য প্রদান করা - যে সুন্দর চিত্রগুলি আমাদের অনেক ভাল বোধ করে। কিন্তু এই গবেষণা না করা পর্যন্ত আমরা যা বুঝতে পারিনি তা হল মস্তিষ্কের উপর শিল্পের প্রভাব কতটা শক্তিশালী। এখন জনগণের জন্য শিল্পের প্রয়োজনীয়তার প্রমাণ হিসেবে এই গবেষণাকে ধরা হচ্ছে।
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড এর শনিবারের ক্রোড়পত্র ইজেল -এ প্রকাশিত
লেখকঃ জয় প্রকাশ সঞ্জয় দাশ